ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৫ ডিসেম্বর ২০১২

কাসাফাদ্দৌজা নোমান

গল্প: একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার আত্নার কাল্পনিক কথা

বিশালাকায় কোন মানচিত্র নয়, ছোট্র একটি মানচিত্রের পিঠ চাপড়ে বললাম "তুই ভাল থাকিস।" সবুজ আর লালে উড়তে থাকা পতাকাকে বললাম "তুই আমার দেশ, তুই উড়িস মাকে নিয়ে" আমি চললাম। ভয় পাসনে আমার গায়ে যে রক্ত দেখছিস সেটা রক্ত নয় ঘাম। এই ঘামের পরিশ্রমে মানচিত্র আর পতাকাকে উড়তে দিয়েছি। এই ঘামের প্রতিটি বিন্দু হিসাব করা। কেবল আমি নই লাখ লাখ মানুষ এই ঘাম ঝরিয়েছে।এই ঘামের অবহেলারও হিসাব হবে। হুমম এভাবেই বলতে বলতে চলে গিয়েছিলাম।আজ আবার ফিরে আসলাম। না না জীবন্ত হয়ে না, আত্নার কিছু দ্বায় নিয়ে। আমি নিজেই জানিনা আমি কোথায় সমাহিত হয়েছি। আদৌ কি সমাহিত হয়েছি কিনা? তবে এটা জানি আমার ধর্মের রীতি অনুযায়ী দাহ হয়ে ছিলাম। আমার হাঁড়ের অবশিষ্ট কোন টুকরো আছে কিনা সে ব্যাপারেও আমি নিশ্চিত না। আমার নামইতো বিলীন হতে বসেছে। বাংলাদেশের মানুষই যখন আমার ঘামের কথা ভুলতে বসেছে মাটিই বা কি করবে।

রাজীব চৌধুরী

মরা চোখ 
"মাগো- আমি আর পারিনা গো" বলেই মাটিতে বসে পড়ল মুন্নি। চোখে মুখে ব্যাথা স্পষ্ট হয়ে আছে। পা দুটো ধরে কাঁদতে শুরু করেছে। তার মত ১৪ বছরের মেয়ের জন্য এভাবে মাইলের পর মাইল পথ পারি দেয়া খুবই কষ্টের। সবে মাত্র যৌবনে পা দিয়েছে মুন্নি। কিন্তু এখন তাকে যেতেই হবে। কারন পেছনে হানাদার বাহিনী চলে এসেছে অনেক কাছে। মুন্নির দিকে তাকিয়ে সন্দীপ রায়ের চোখে মুখে স্পষ্ট ভয় প্রকাশ পেল।

৩১ অক্টোবর ২০১২

সিনমিন ইয়াসমিন

দোলনচাঁপা

মেয়েদের বাড়ির প্রতি টান বেশি থাকে কারন তারা জানে যে চাইলেও চিরদিন বাড়িতে থাকতে পারবে না । এক সময় না এক সময় পরের ঘরে যেতেই হবে । ছেলেদের যেহেতু পরের ঘরে যাওয়া জাতীয় কোন ভয় থাকেনা তাই তাদের স্বাভাবিক ভাবেই ঘরের প্রতি টানটা কম থাকে । এখানে অবশ্য কারো কোন দোষ নেই , সৃষ্টি কর্তা উভয়কেই সৃষ্টি করে দিয়েছেন এমন করে । এটা প্রকৃতির নিয়ম ।

সেই নিয়মের অংশ হিসেবেই এখন আমার বুক ফেটে কান্না আসছে কারন কিছুক্ষণ আগেই আমি আমার নিজের বাড়ি ছেড়ে এসেছি । আজকে থেকে আমাকে থাকতে হবে অচেনা একটা পরিবেশে । অচেনা কারন আমি আজই প্রথম এই বাড়িতে এলাম । মানুষগুলো আমার আপনজন কিন্তু এখনও আমি কাউকে ঠিক মতো চিনিনা । চেনার সুযোগটাই পাইনি । কেমন করে জানি সব কিছু খুব দ্রুত হয়ে গেলো ।

একের পর এক লোকজন আসছে আমাকে দেখতে । ছবির জন্য পোজ দিতে দিতে আমি কাহিল হয়ে গেছি । নিজেকে চিড়িয়াখানার কোন প্রাণী মনে হচ্ছে । মানুষজন খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছে আমাকে , নানান প্রশ্ন করছে । তবে সবচেয়ে বেশি যে ব্যাপারটা আমাকে বিব্রত করছে সেটা হল বেশীর ভাগ লোকের কথাই আমি বুজতে পারছিনা। কারন ওরা কথা বলছে একটা আঞ্চলিক ভাষায় । এই ভাষাটা এখনও আমি ঠিক রপ্ত করে উঠতে পারিনি । মনে হয় কিছুটা সময় লাগবে আমার কারণ আমি ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে অভ্যস্ত । আমার আশে পাশেও তাই । এই কারনেই এখন আমার মনে হচ্ছে যেন মঙ্গল গ্রহে চলে এসেছি তবে শান্তি লাগছে এই দেখে যে মানুষটা আমাকে যথাসম্ভব আগলে রাখার চেষ্টা করছে । বেশির ভাগ কথার জবাব মানুষটাই দিচ্ছে । কেউ কেউ এটা নিয়ে ঠাট্টাও করছে যে এখনই এত বউ পাগল পরে কি হবে ।

পরে কি হবে আমি নিজেও জানি না । আমাদের বিয়েটা একদমই পারিবারিকভাবে হয়েছে । আমরা দুজন দুজনকে তেমন একটা জানার সুযোগই পাই নি । তবে এ বাড়িতে আসার পর থেকে ও আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে যায়নি , আশেপাশেই আছে । ওই মুখের দিকে তাকিয়ে আমি কিছুটা ভরসা পাচ্ছি । তবে এই মুহূর্তে বাড়ির কথা খুব মনে পরছে । বাড়ির বাইরে থেকেছি আমি খুব কমই । এক দিন থাকতেই আমার অস্থির লাগতো এখনত এটা ভেবে আরও বেশি অস্থির লাগছে যে এখন থেকে এখানেই থাকতে হবে । কান্না আসছে খুব কিন্তু কাঁদতে পারছিনা ।

প্রথম যে দিন আমি বাসার বাইরে থেকেছিলাম সেটা হচ্ছে আমার ভার্সিটির হল  লাইফ এর প্রথম রাত । বাসার জন্য এত মন খারাপ লাগছিল যে সারাটা রাত বারান্দায় দাড়িয়ে কেঁদেছি । পরদিন সকাল হতেই বাড়ি চলে গেছি । এ নিয়ে বন্ধুরা এখনও অনেক হাসাহাসি করে । হাসাহাসি করলেই বা আমার কি যায় আসে , আমি থাকতে পারিনা তো এখন কি করব ? ৬ মাস অনেক কষ্টে থাকার পর আমি আবার বাসায় চলে গিয়েছিলাম একদম সব কিছু নিয়ে । এর পর থেকে প্রতিদিন অনেকটা পথ বাস জার্নি করে ক্লাস করতাম । কিন্তু এখন কি করবো ? এখনত চাইলেও আর যেতে পারবনা । সারাজীবনের জন্য বাঁধা পরে গেলাম...

ভাবী , চলো ...

ভাবতে ভাবতে একদম নিজের মাঝে ডুবে গিয়েছিলাম । মেয়েটা যে আমাকেই ডাকছে বুজতে পারছিলামনা । না বুঝার অবশ্য আরও একটা কারন আছে । এখন পর্যন্ত অনেক ডাক ই শুনেছি কিন্তু ভাবী ডাকটা এই বাড়িতে আসার পর থেকে শুনছি তাই এখনও ঠিক অভ্যস্ত হতে পারিনি ।

কই... এসো...

আমি উঠে দাঁড়ালাম । মনে হল যেন অনন্তকাল ধরে বসে ছিলাম । পা এ ঝি ঝি ধরে গেছে । আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলাম । কোথায় যাচ্ছি বুজতে পারছিনা । মানুষটাকেও আশেপাশে কোথাও দেখছিনা । অনেক বাঁধাবিপত্তি পেড়িয়ে দোতলায় এলাম । বাড়িটা বেশ সুন্দর । পছন্দ হয়েছে আমার । যে ঘরটায়টায় আমরা এলাম খুব সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো । শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা শিহরণ বয়ে গেলো...

এটা তোমার ঘর , পছন্দ হয়েছে ?

আমি তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলাম । এর মানে পছন্দ হয়েছে ।

এখানে সব কিছু দেয়া আছে , তুমি ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও । সারাদিন অনেক ধকল গেছে তোমার উপর দিয়ে । আর কেউ বিরক্ত করবে না । আমি ভাইয়া কে পাঠিয়ে দিচ্ছি ।

শেস কথাটা বলার সময় দেখলাম ওর চোখে দুষ্টমি খেলা করছে ।

আমি ঘরটা ভাল করে দেখতে লাগলাম । জানালার পাশে গেলাম । বন্ধ ছিল কারন ঘরে এসি চলছে । জানালাটা খুলতেই একটা ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে গাঁয়ে লাগলো । মনে হয় কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়েছে । ইসশ... খুব ছাদে যেতে ইচ্ছে করছে । মানুষটা যদি থাকতো বলে দেখা যেত । কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেলো এখনও দেখা নেই ।

ঠাণ্ডা পানির নিচে দাড়িয়ে সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল । অনেকটা সময় নিয়ে শাওয়ার নিলাম । গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে ঘরে এলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় ২ টা বাজতে চললো , এখনও এলো না ? ঘুম আসছে আমার খুব কিন্তু মানুষটা কে রেখে ঘুমিয়ে পরবো ? মন সায় দিচ্ছেনা । একটা বই নিয়ে সোফায় যেয়ে আধ-শোয়া হয়ে বসলাম ।

 

মনে হল অনন্ত কাল পর সিঁড়িতে কারো পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে । কেন জানি হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে বসলো আমাকে । আমি উঠে বসলাম সাথে সাথেই দরজা খুলে গেলো । আমি কেঁপে উঠলাম , ব্যাপারটা মানুষটার চোখ এরায়নি ।

আরে আরে , তুমি এমন কাঁপছ কেন । রিল্যাক্স এন্ড সরি , দেরি হয়ে গেল । তোমাকে অনেক্ষন একা থাকতে হল ।

আমি স্বাভাবিক ভাবে হাসার চেষ্টা করলাম । না , ঠিক আছে , কোন সমস্যা হয়নি। বইটা পড়তে পড়তেই সময় কেটে গেছে ।

আসলে তোমার কারনেই একটু দেড়ি হয়ে গেলো ।

আমার কারনে ? বলে কি এই ছেলে , আমি আবার কি করলাম ?

 আমার কারনে দেড়ি হল , আসলে ব্যাপারটা ঠিক বুজলাম না । একটু বুঝিয়ে বলুনতো ।

বলার চেয়ে দেখালেই বেশি ভাল হয় না ? চোখ বন্ধ করো...

এ আবার কেমন কথা । চোখ বন্ধ করবো কি জন্য ?

ঠিক আছে না বন্ধ করলে দেখাবনা ।

আচ্ছা ঠিক আছে , এই যে চোখ বন্ধ করলাম...

মানুষটা আমার সামনে থেকে উঠে যেয়ে আবার ফেরত আসলো । মিষ্টি একটা গন্ধ নাকে এসে লাগলো । খুব চেনা চেনা কিন্তু মনে পরছেনা ।

হুম্ম... এবার চোখ খুলো ।

চোখ  খুলে আমি থ...

কি পছন্দ হয়েছে ?

মানুষটার হাতে খুব সুন্দর একটা ঝুড়ি আর ঝুড়িটা ভরতি দোলনচাঁপা...ওখান থেকেই মাতাল করা গন্ধটা আসছে । আমি খুশি চেপে রাখতে পারছিনা । এতো অবাক হয়েছি যে কি বলবো ।

আপনি জানলেন কি করে যে দোলনচাঁপা আমার খুব প্রিয় ?

জেনেছি... ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয় ম্যাডাম । আর আপনার জন্য এই ফুল খুঁজে আনতেই এতো দেড়ি হয়ে গেলো । এবার বলুন , খুশি হয়েছেনতো ?

আমি কি বলবো কোন ভাষাই খুঁজে পাচ্ছিনা । এই মুহূর্তে নিজেকে সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে । আমার জন্য মানুষটা এতো কষ্ট করে দোলনচাঁপা নিয়ে এসেছে , খুশিতে আমার চোখে পানি চলে এলো...

কি হল , কাঁদছ কেন ? বাড়ির কথা মনে পরছে ? আরে কি হল , না বললে বুজবো কি করে ?

আমি কাছে এসে মানুষটাকে জড়িয়ে ধরলাম । ওর বুকে মাথা রেখে বললাম , এমন করে সারাজীবন ভালবাসবেতো আমায় ?

গভীর আবেগে মানুষটা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল... সারাজীবন...।

 

 

মৌ দাশগুপ্তা

স্ত্রীধন

জীবনের সায়াহ্নে পৌঁছে জীবনবাবুর মনে হল, ঢের কাজ করা হয়েছে এবার তবে
আরাম করে স্থিতু হওয়া যাক।শুধুমাত্র পরিশ্রম আর সৌভাগ্যের হাত ধরে এতবছর
জীবনের সাথে ইদুঁরদৌড় আজ তিনি ক্লান্ত।সাইকেল নিয়ে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে
শাড়ী ফেরি করা কিশোর আজ প্রতিষ্ঠিত বস্ত্র-ব্যবসায়ী।কিন্তু লাভের
গুড়টা আর খায় কে?

অতএব, চাই একটি ঘরনী।যা ভাবা,তাই কাজ। অনতিবিলম্বে ফাঁকা ঘরে সানাইয়ের
মধুর সুর।মধুরাত।প্রৌঢ় জীবনবাবু বাসরঘরে কিছুটা জাঁক করেই তরুণী সুন্দরী
স্ত্রীকে বললেন,
-দেখেছো তো, ঘর আমার বেবাক ফাঁকা, তুমিই আমার ফাঁকা ঘরে লক্ষ্মী হয়ে
এলে। আমার যা কিছু আছে সব-ই তো তোমার স্ত্রীধন। দেখো বাপু, আমি কিন্তু
খুব স্পষ্ট কথার মানুষ। এ বয়সে শরীরটা হয়তো বেগড়বাই করবে, স্ত্রীসুখ
হয়তো তুমি পাবেনা, তবে তোমার টাকা-পয়সা গয়না-গাঁটিতে কোন অভাব
থাকবেনা। আজ আমাদের মধুরাত, তা তুমি কি চাও আজ আমার থেকে? বলো , বলোই না,
লজ্জা পাবার তো কিছু নেই।

লাল চেলী, সোনার গয়না জড়ানো বউ হয়তো বললো, "আমার সৌভাগ্য" , কিন্তু
জীবনবাবু স্পষ্ট শুনলেন নতুন বউ অস্ফুটে বললো, "আমার বৈধব্য"।
 

সুমাইয়া আদ্রিত

অব্যক্ত অনুভূতি

প্রতিটি মানুষেরই হয়্ত নিজস্ব একটা জগত থাকে। আমার বেলাতেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। আমারও একটা নিজস্ব জগত আছে। কিংবা ছিল ! আমার জগতটি গড়ে উঠেছিল তাকে কেন্দ্র করে। তার  প্রতিটি আচরণই  অতিমাত্রায় ভাল লাগতো আমার । যা  সবার কাছে হয়্ত ছিল ন্যাকামো কিংবা পাগলামীর চূড়ান্ত । কিন্তু আমার কাছে সেগুলো  ছিল সবচেয়ে প্রিয় । গলির ভেতর থেকে খুজে পাওয়া  বৃষ্টিতে ভেজা জরাজীর্ণ  বিড়াল  ছানাটিকে নিয়ে যখন হুল্স্থুল কান্ড বাঁধিয়ে  দিত সে , তখন তা সবার কাছে বিরক্তিকর হলেও  আমার কাছে তা ছিল খুবই  আনন্দের একটা ব্যাপার । খালি পায়ে হিমু বেশে রাতের রাস্তায় যখন সে  হেঁটে বেড়াত , তখন তার সঙ্গী হওয়ার ইচ্ছেটাকে খুব কষ্টে দমন করতাম । রাস্তার ছোট ছেলেমেয়েগুলো যারা তার কাছে ছিল " স্পেশাল কিডস " তাদের মাঝে বিক্ষিপ্ত  আনন্দ বিতরণ করে যে আনন্দটা সে পেত  তার ভাগ নিতে বড্ড ইচ্ছে করতো । জন্মদিনগুলোই  সবার আগে এসে যখন  ঘুম ভাঙিয়ে চিৎকার করে বলতো  -'শুভ জন্মদিন্' তখন যেন  সবচেয়ে বড় উপহারটা  পাওয়া  হয়ে যেজ। তার লিখা কবিতাগুলোর একমাত্র  পাঠক বোধ্হয়  আমি-ই  ছিলাম । যা  আমার কাছে ছিল গুপ্তধনের মত । একদিন জানতে পারলাম  এই হাস্যজ্বল  প্রানবন্ত মানুষটি  কর্কটক্রান্তিদের এক্জন। সেদিন আমার পৃথিবীর  একটা অংশ যেন অবশ হয়ে  গিয়েছিল।

আজ সে নেই। এই ক'দিন  হল কর্কটক্রান্তি  রেখার মাঝে হারিয়ে গিয়েছে সে । তবুও  ভুলতে পারিনা  তাকে।।। প্রতিটি  মুহুর্তে তার অদৃশ্য  উপস্থিতি অনুভব করি। মনে হয় এই হয়্ত কোন বেড়াল ছানা  নিয়ে হাজির হবে। কিংবা হাতটা ধরে বলবে , 'চল  বৃষ্টিতে ভিজি । ঠাণ্ডা  লাগলে  সব দোষ তোর ।। প্রতি রাতেই জানালার ধারে বসে অপেক্ষা করি  এই হয়্ত চুপিসারে আসবে আমার কাছে সে । তারপর  তার ভুবন ভুলানো  হাসিতে হেসে বলবে ,''একেবারেই ভুলে  গিয়েছিস তোর  দা-ভাইকে?'"

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১২

সরদার ফারুক

 অনুরাধা টেইলারিং হাউজ

এই গলিটার পাশেই ছিল অনুরাধা টেইলারিং হাউজ । প্রকাণ্ড শিরিষ গাছের নিচে লম্বা একটা ঘর । অনেকগুলো সেলাই মেশিনে ঘরঘর শব্দ তুলে নানা বয়সের কারিগর কাজ করে যেত ।ছেলেছোকড়ারা নিচে বসে বোতাম লাগাতো ,ব্লাউজের হুক লাগাতো ।দোকানের পেছনেই কর্মীদের থাকার জন্য এক সারি ঘর ।

অনেকদিন আগে এখানেই আমি দর্জির কাজ শিখতাম ।এতিমখানার শিশুসদনে ক্লাস এইটে আমার রেজাল্ট দেখে সুপার আপা বললেন -“ তোর হবে না , এবার কিছু একটা হাতের কাজ শিখে নে।”
আমরা যারা শিক্ষানবীশ , বেতন-টেতন তেমন কিছু পেতাম না , মাঝে মধ্যে দশ-বিশ টাকা হাতখরচ আর দু’বেলা খাবার ।অনেকটার পেটে-ভাতেই বলা যায় , ভাত মানে মোটা চালের ভাত ।বাজারে যখন যে সবজিটা শস্তা , সেই সবজিটার একরকমের লাবড়া বানানো হতো ।সাথে থাকতো রঙহীন পাতলা ডাল , আমরা বলতাম -কানার চোখের জল ।
হয়তো কিছুদিন একটানা পেপের লাবড়া চলছে , তারপর শুরু হতো পাতাকপির ঝোল । ভাগ্য ভালো হলে কখনো কখনো ঈদের চাঁদের মতো নলামাছের পাতলা একটা টুকরো পাতে পড়তো । সেদিনটা খুব আনন্দের দিন ।

রাজীব চৌধুরী

ইকারাসের সমুদ্র পতন

আমার পরিবারের পুরুষ দের মাথায় কিঞ্চিত ছিট আছে। বেশির ভাগই ছিলেন ভ্রমণ প্রিয়- এডভেঞ্চার প্রিয়। উড়ূ ঊড়ু মনের মানুষ গুলোর অনেকেই জীবনের বিশাল একটা সময় কাটিয়ে দিয়েছেন ঘুরতে ঘুরতে।যেমন আমার দাদির মুখে শুনেছি আম
ার দাদা ছিলেন বিশাল জমিদার। কিন্তু কি এক নেশায় তিনি চলে যান বার্মায়। সেখান থেকে আর ফেরেন নি তিনি। কেউ এখনো জানেনা উনার কিভাবে মৃত্যু হয়েছে- কোথায় দাফন হয়েছে। আমার দাদুর বাবা ও ছিলেন জমিদার। তিনি জন্ম সুত্রে জমিদারি পেয়েছিলেন। সেই আমলে তিনি প্রায়শই সাধারণ বনিক দের সাথে খামোখাই যুদ্ধ বিগ্রহে জড়িয়ে যেতেন। আবার উনার ছিল শিকারের নেশা। সেই একবার এক বাঘ শিকার করতে গেছিলেন সমতট জংগলে। আর ফিরে আসেন নি তিনি। তাঁর আগের লোকজন দের কথা আমি জানিনা। তবে শুনেছি সম্রাট জাহাঙ্গিরের আমল থেকে আমাদের পরিবার এই বঙ্গ তথা বাংলাদেশে।সেই সময় সাহসিকতার জন্য আমাদের পরিবার কে দেয়া হয়েছিল চৌধুরী উপাধি। আরেকটা উপাধি ও আছে। সেটা হল ছিট পরিবার। আমাদের পরিবারের সব পুরুষের মাথায় সামান্য পরিমান ছিট থাকার কারনে এই উপাধি দিয়েছে আমাদের পরিবারের ই নারী কুল।

শুভ্র নীল

অনুগল্প সমগ্র-

১.মইনের বাসার বারান্দাটা বেশ বড়, প্লাস্টিকের একটা মোড়ায় বসে সুন্দর আকাশ দেখা যায়। ইদানিং এখানে বৃষ্টি হচ্ছে খুব সারাবেলা। বারান্দায় বসে হাজার রকম ইচ্ছা-অনিচ্ছার ছবি আঁকে মইন। সামনের ছয় তলার বারান্দার তারে ঝুলিয়ে রাখা কাপড়ের মালিকিনকে দেখতে ইচ্ছে হয় তার। কিন্তু কখন যে কাপড় দিয়ে যায় আর কখন নিয়ে যায় টের পায়না মইন। কিংবা তিন তলার সেই নিঃসঙ্গ তরুণীটির সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে যে কিনা অলস বিকেলটা একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। জানতে ইচ্ছে করে তার বিষণ্ণতার কারণ। এই ইচ্ছেটাও অনিচ্ছায় রূপ নেয় যখন তরুণীর বাচ্চাটি হঠাৎ পেছন থেকে এসে দু হাত দিয়ে চোখ ধরে বসে মায়ের। মইন ইচ্ছে বদলিয়ে ভাবার চেষ্টা করে সেই মেয়েটির কথা, যে তার বারান্দার দরজা অল্প একটু খুলে দ্রুত ওড়নাটি নিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়, আর খানিকক্ষণ বাদে লাইট বন্ধ করে জানালার পর্দার ফাঁকে খুঁজতে থাকে। তখন মইনের চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, এই যে আপনি লজ্জা পাবেন না, আমি আপনার কোন দেহ আবয়ব দেখিনি। শুধু বুঝতে পেরেছি আপনি কম সময়ে ওড়নাটি নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। আপনার কোন দোষ নেই। আড়াল থেকে আমাকে দেখার কিছু নেই। দেখতে হলে দরজা খুলে বারান্দায় আসুন। রাতে ইলেক্ট্রিসিটি যখন চলে যায় কারো সাথে বাসার নিচের রাস্তায় হাঁটতে ইচ্ছে করে তার। ওপাশের বিল্ডিং এর থলথলে শরীরের বাল্য বন্ধু ইশতিয়াকের কথাও ভাবতে ইচ্ছে করে। ব্লেড দিয়ে বন্ধুকে খুন করার কথা প্রায়ই ভাবে সে। এককালের সমাজতন্ত্র বলতে বলতে শাহবাগ চত্বরে মুখে ফেনা তুলে ফেলা ইশতিয়াক আজ পুঁজিবাদী কর্পোরেট সমাজের অধিপতি, তাই? না। শিরিনের কথা মনে করতে চায় না মইন। তারচেয়ে সামনের ছয় তলার বারান্দার তারে ঝুলিয়ে রাখা কাপড়ের মালিকিনকে দেখতে ইচ্ছে হয় তার।

কাসাফাদ্দৌজা নোমান

খোঁজ

হাঁটতে হাঁটতে পায়ের লিগাম্যান্ট বোধহয় ছিড়েই গেল। না জানি কপালে আরও কথা হন্টন আছে।“সাগর বাইন্ডিংস” খুজছি গত এক ঘন্টা যাবত। বাবার বন্ধুর দোকান। বড় বোনের বিয়ের দাওয়াত পৌছে দিতে হচ্ছে এটা ভেবেই কষ্ট লাগছে। বিয়ের দাওয়াত দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত না আবার নিজের কুলখানীর দাওয়াত দিতে হয়! এই মোবাইলের যুগে বিয়ের দাওয়াত স্ব-শরীরে পৌছে দেয়ার কি দরকার মাথায় ঢুকছে না। বাবারা পারেও বটে। গত বাইশ বছর বাবার সাথে তার বন্ধুর কোন যোগাযোগ নেই অথচ নিজের মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিতে হবে। তাও আমাকে এসেই দিতে হবে। অবশ্য কিছু করারও নেই। বাবা শাররীক অবস্থা যা আসা একেবারেই অসম্ভব। “ওই ভাই সাইড দ্যান”। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তা পুরো দখল করে নিয়েছিলাম।

জবরুল আলম সুমন

ভেসে যায় বৃষ্টির জলে

সময়েরা এতো দ্রুত পালায় কেন ? সময়েরা কি স্থির থাকতে জানেনা ? দেশে বিদেশে কত শত অদ্ভূত আইন কানুন তৈরী হয় মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলা বোধ তৈরী করার জন্য, আচ্ছা এমন কি কোন আইন তৈরী করা যায়না যে আইনের বলে সময়েরা স্থির হয়ে থাকবে, একটুও নড়া চড়া করবেনা। যদি তাই করা যেত তবে হয়তো সোমা'কে কেউ আর ঘরে আটকে রাখতে পারতো না চোখের বেড়া দিয়ে। একটু একটু করে পালিয়ে যাওয়া সময়েরা সোমার সবটুকু শৈশব চুরি করে নিয়ে গেছে আর সেই সাথে হাতে ধরিয়ে দিয়েছে কৈশোরের টিকিট। সোমা আজ চৌদ্দ বছরের এক বাড়ন্ত কিশোরী। তার বয়সটাই বলে দেয় সে আর আগের মতো নেই, তাকে এখন শাসনের বেড়াজালে থাকতে হয় প্রতি মুহুর্ত। সে কোথায় দাঁড়াবে, কোথায় বসবে, কোন দিকে তাকাবে, কোন পথে হাঁটবে তার সবটুকুই এখন মা'য়ের সিদ্ধান্তে করতে হয়। ওড়নাটা গলায় পেঁচাবে নাকি শরীরে জড়িয়ে রাখবে তাও মা ঠিক করে দেন। আচ্ছা মায়েরা এমন হয় কেন ? তারা কি এই সময়টুকুন পার করে আসেনি যে সময়ের ভেতর দিয়ে এখন সোমা পার হচ্ছে ? তবে তারা কেন বুঝতে চায়না এই বাড়ন্ত মনের ভিতরে রোজ রোজ কত স্বপ্ন বেড়ে ওঠে, স্বপ্নের ডাল পালা মেলতে না মেলতেই মায়েরা কেন তা শাসনের কাঁচি দিয়ে ছেটে ফেলে, কেটে ফেলে ? এই ত মাত্র ক'বছর আগেও, কত বছর, পাঁচ কিংবা ছয়। যখন সোমা একটা হাফ প্যান্ট আর হাত কাটা পাতলা গেঞ্জি পরে টেলিভিশনের সামনে বসে কার্টুন দেখতো ঠিক তক্ষনি রান্না ঘর থেকে মা ডাক দিয়ে বলতো "সোমা, যা ত মল্লিকের দোকান থেকে তোর বাবার কথা বলে হাফ কেজি মশুর ডাল নিয়ে আয়, শুধু ডাল নিয়ে আসবি সাথে যেন ক্যান্ডি ফ্যান্ডি না আসে" তখনো কিন্তু মা বলেনি 'সোমা, দোকানে যাওয়ার আগে গায়ে ওড়নাটা জড়িয়ে নিয়ো' সেই মা এখনো রান্না ঘর থেকে ডাক দেয় তবে মল্লিকের দোকানে যাওয়ার জন্য নয়, সময়ে অসময়ে যেন বারান্দাতেও পা না বাড়ায় তার জন্য। সোমা কখনোই তার মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে পারেনা, তাই মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করে বারান্দাতেও যাওয়া হয়না যখন তখন। অথচ তার ভেতরটা এক মুহুর্তে চার দেয়ালের চৌকাঠ মাড়িয়ে চলে যায় বাসার ছাদে, উঠোনে কিংবা গলির মাথার ওই খেলার মাঠটাতে যেখানে পাড়ার অন্যসব ছেলে মেয়ে স্কুল শেষে এক জোট হয়ে হরেক রকমের কত খেলায় মেতে উঠে।